বাংলাদেশে কারিগরি শিক্ষার ভবিষ্যৎ ও গুরুত্ব

বাংলাদেশে কারিগরি শিক্ষার ভবিষ্যৎ ও গুরুত্ব শিক্ষার্থীদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারিগরি শিক্ষা শুধু দক্ষ কর্মী তৈরি করে না, বরং দেশের শিল্প ও প্রযুক্তি খাতের উন্নয়নেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এটি শিক্ষার্থীর হাতে বাস্তব দক্ষতা, সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা এবং আত্মনির্ভরতা বৃদ্ধি করে।
বাংলাদেশে কারিগরি শিক্ষার ভবিষ্যৎ ও গুরুত্ব
একজন শিক্ষার্থী হিসেবে কারিগরি শিক্ষার সুযোগ ও গুরুত্ব বোঝা থাকলে পেশাগত জীবন আরও সুসংহত হয়। আসুন আমরা এবার বাংলাদেশে কারিগরি শিক্ষার ভবিষ্যৎ ও গুরুত্ব নিয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনা শুরু করি।

বাংলাদেশে কারিগরি শিক্ষার বর্তমান অবস্থা

বাংলাদেশে কারিগরি শিক্ষার বর্তমান অবস্থা যেন এক ধরনের রূপান্তরের সংকেত বহন করছে। একদিকে সম্ভাবনার দরজা খুলছে, অন্যদিকে দীর্ঘদিনের অবহেলা এখনো পুরোপুরি কাটেনি। দেশের অনেক কারিগরি প্রতিষ্ঠান এখনো পুরনো ধ্যানধারণার শিক্ষা ব্যবস্থায় আটকে আছে, যেখানে যন্ত্রপাতি আপডেট করার চেয়ে যত্ন নেওয়াই বড় চ্যালেঞ্জ।

অনেক জায়গায় দেখা যায়, কোনো মেশিন বছরজুড়ে ব্যবহারই হয় না, কারণ সেটি চালানোর দক্ষ প্রশিক্ষকই নেই। এমনকি কিছু প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীরা বাস্তব কাজের পরিবেশ কেমন তা কখনো নিজের চোখে দেখতে পায় না। প্র্যাকটিকালের ধারণা বইয়ের ছবিতেই সীমাবদ্ধ থাকে। আরেকটি উল্লেখযোগ্য সমস্যা হলো সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি।

এখনও অনেক পরিবার মনে করে, ভালো রেজাল্ট করতে না পারলেই শুধু কারিগরি শিক্ষায় ভর্তি হওয়া যায়। এই ভুল ধারণার ফলে দক্ষতা ভিত্তিক পেশাকে সম্মান দেওয়ার যে সংস্কৃতি, সেটি গড়ে উঠতে পারছে না। অথচ অনেক ইউরোপীয় দেশে কারিগরি ডিগ্রি পাওয়া মানে চাকরি পাওয়ার নিশ্চয়তা কিন্তু বাংলাদেশে সেই আস্থা এখনো তৈরি হয়নি।

এদিকে একটি নতুন পরিবর্তনও দেখা যাচ্ছে। শহরের তুলনায় গ্রামীণ এলাকায় একটু ভিন্ন বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। অনেক শিক্ষার্থী এখন কৃষি প্রযুক্তি, গ্রামীণ প্রকৌশল বা সোলার সিস্টেম মেইনটেন্যান্সের মতো ক্ষেত্রগুলোতে দক্ষতা অর্জন করছে, কারণ তারা নিজের এলাকাতেই কাজের সুযোগ পাচ্ছে। 

তবে এই পরিবর্তন এখনো বিচ্ছিন্ন, সুষম ও রাষ্ট্রীয়ভাবে সমন্বিত নয়।সব মিলিয়ে, বাংলাদেশের কারিগরি শিক্ষা এখন রূপান্তরের মোড়ে দাঁড়িয়ে। কাঠামোগত উন্নয়ন, প্রশিক্ষকের দক্ষতা বৃদ্ধি এবং সামাজিক মানসিকতার পরিবর্তন ঘটাতে পারলে এটি দেশের অর্থনীতির অন্যতম শক্তিশালী ভিত্তিতে পরিণত হতে পারে।

কারিগরি শিক্ষার ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা বিশ্লেষণ

বাংলাদেশে কারিগরি শিক্ষার বর্তমান অবস্থা যেন এক ধরনের রূপান্তরের সংকেত বহন করছে।একদিকে সম্ভাবনার দরজা খুলছে, অন্যদিকে দীর্ঘদিনের অবহেলা এখনো পুরোপুরি কাটেনি। দেশের অনেক কারিগরি প্রতিষ্ঠান এখনো পুরনো ধ্যানধারণার শিক্ষা ব্যবস্থায় আটকে আছে, যেখানে যন্ত্রপাতি আপডেট করার চেয়ে যত্ন নেওয়াই বড় চ্যালেঞ্জ।

অনেক জায়গায় দেখা যায়, কোনো মেশিন বছরজুড়ে ব্যবহারই হয় না, কারণ সেটি চালানোর দক্ষ প্রশিক্ষকই নেই। এমনকি কিছু প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীরা বাস্তব কাজের পরিবেশ কেমন তা কখনো নিজের চোখে দেখতে পায় না। প্র্যাকটিকালের ধারণা বইয়ের ছবিতেই সীমাবদ্ধ থাকে। আরেকটি উল্লেখযোগ্য সমস্যা হলো সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি।

এখনও অনেক পরিবার মনে করে, ভালো রেজাল্ট করতে না পারলেই শুধু কারিগরি শিক্ষায় ভর্তি হওয়া যায়। এই ভুল ধারণার ফলে দক্ষতা ভিত্তিক পেশাকে সম্মান দেওয়ার যে সংস্কৃতি, সেটি গড়ে উঠতে পারছে না। অথচ অনেক ইউরোপীয় দেশে কারিগরি ডিগ্রি পাওয়া মানে চাকরি পাওয়ার নিশ্চয়তা, কিন্তু বাংলাদেশে সেই আস্থা এখনো তৈরি হয়নি।

এদিকে একটি নতুন পরিবর্তনও দেখা যাচ্ছে। শহরের তুলনায় গ্রামীণ এলাকায় একটু ভিন্ন বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। অনেক শিক্ষার্থী এখন কৃষি প্রযুক্তি, গ্রামীণ প্রকৌশল বা সোলার সিস্টেম মেইনটেন্যান্সের মতো ক্ষেত্রগুলোতে দক্ষতা অর্জন করছে, কারণ তারা নিজের এলাকাতেই কাজের সুযোগ পাচ্ছে। 

তবে এই পরিবর্তন এখনো বিচ্ছিন্ন, সুষম ও রাষ্ট্রীয়ভাবে সমন্বিত নয়।সব মিলিয়ে, বাংলাদেশের কারিগরি শিক্ষা এখন রূপান্তরের মোড়ে দাঁড়িয়ে। কাঠামোগত উন্নয়ন, প্রশিক্ষকের দক্ষতা বৃদ্ধি এবং সামাজিক মানসিকতার পরিবর্তন ঘটাতে পারলে এটি দেশের অর্থনীতির অন্যতম শক্তিশালী ভিত্তিতে পরিণত হতে পারে।

কারিগরি শিক্ষার গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা

বাংলাদেশে কারিগরি শিক্ষার গুরুত্ব কেবল চাকরি পাওয়ার বিকল্প পথ হিসেবে সীমাবদ্ধ নয়, এটি একটি দেশের উৎপাদনশীলতা, উদ্ভাবন এবং আত্মনির্ভরতার মূল ভরসা। সাধারণ শিক্ষা যেখানে জ্ঞান তৈরি করে, সেখানে কারিগরি শিক্ষা সেই জ্ঞানকে কাজে লাগানোর সক্ষমতা গড়ে তোলে।

বর্তমান বিশ্বে পরিবর্তনের গতি এত দ্রুত যে শুধুমাত্র তত্ত্ব জানলেই চলবে না। হাতে-কলমে দক্ষতা ছাড়া কোনো শিল্প বা প্রযুক্তি খাতেই এগিয়ে থাকা সম্ভব নয়। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে কারিগরি শিক্ষাই সেই ঘাটতি পূরণ করতে পারে। 

এখনকার বাস্তবতা হলো, শিল্প ও উৎপাদন খাতে দক্ষ কর্মীর চাহিদা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে তারা প্রায়শই স্থানীয়ভাবে কর্মী না পেয়ে বিদেশি শ্রমিক নিয়ে আসতে বাধ্য হয়। অথচ দেশের তরুণদের কর্মসংস্থানের সমস্যা এখনো রয়ে গেছে। এই বৈপরীত্যের মূলে রয়েছে দক্ষতার ঘাটতি, যা কারিগরি শিক্ষা থাকলে সহজেই পূরণ করা যেত।

বিশেষ করে বৈদ্যুতিক সিস্টেম, অটোমেশন, কৃষি-প্রযুক্তি, মেশিন অপারেশন ও সোলার এনার্জির মতো ক্ষেত্রে দক্ষতার প্রয়োজন দিনদিন বাড়ছে। কারিগরি শিক্ষার আরেকটি প্রয়োজনীয়তা হলো, এটি তরুণদের স্বনির্ভর হতে সাহায্য করে।

ছোট মেরামতের কাজ, ডিজিটাল সার্ভিস, গ্রামীণ প্রযুক্তি সহায়তা কিংবা মিনি-ওয়ার্কশপ চালানো এগুলো সবই কারিগরি দক্ষতার ওপর দাঁড়ানো। ফলে কর্মসংস্থান শুধু শহরে নয়, গ্রামেও তৈরি হয়।সব মিলিয়ে, কারিগরি শিক্ষা এমন এক শক্তি যা কেবল ব্যক্তির জীবনে নয়,

জাতীয় অর্থনীতির গতিতেও সরাসরি প্রভাব ফেলে। দক্ষতার মান যত বাড়বে, দেশের উন্নয়নের পথও তত দ্রুত খুলে যাবে। এটাই কারিগরি শিক্ষার মূল প্রয়োজনীয়তা।

প্রযুক্তিনির্ভর কারিগরি শিক্ষার উন্নয়ন

বাংলাদেশে প্রযুক্তিনির্ভর কারিগরি শিক্ষার উন্নয়ন এখন আর শুধু একটি শিক্ষাগত পরিবর্তন নয়, এটি ভবিষ্যতের কর্মবাজারে দেশকে প্রতিযোগিতাপূর্ণ অবস্থানে তোলার অত্যাবশ্যক শর্ত। শিল্পকারখানা থেকে শুরু করে ডিজিটাল সেবা, কৃষি প্রযুক্তি কিংবা নবায়নযোগ্য জ্বালানি, প্রতিটি ক্ষেত্রে যেসব দক্ষতা প্রয়োজন, 

তার মূল ভিত্তিই আধুনিক প্রযুক্তি। তাই কারিগরি শিক্ষা যত বেশি প্রযুক্তিগত হবে, শিক্ষার্থী তত বেশি বাস্তব কাজের জন্য প্রস্তুত হতে পারবে। আজকের বিশ্বে মেশিন লার্নিং–উন্নত কারখানা, স্মার্ট অটোমেশন, রোবোটিক মেইনটেন্যান্স কিংবা ক্লাউড–ভিত্তিক যন্ত্রপাতি ব্যবস্থাপনার মতো বিষয়গুলো দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে,

অথচ দেশের অনেক প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীরা এখনো পুরনো ল্যাবে কাজ শিখছে।প্রযুক্তিনির্ভর কারিগরি শিক্ষার উন্নয়নে সবচেয়ে বড় প্রয়োজন হলো কার্যকর লার্নিং ল্যাব ও আপডেটেড যন্ত্রপাতি। কিন্তু তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো শিল্পখাতের সাথে সরাসরি সংযোগ। বিশ্বমানের অনেক দেশ শিক্ষার্থীদের পাঠ্যক্রমে বাস্তব প্রকল্প সংযুক্ত করে,

যাতে ক্লাসরুমেই তারা মেশিন বা সফটওয়্যারের প্রকৃত ব্যবহারের ধারণা পায়। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই ধরনের উদ্যোগ খুব কম দেখা যায়, যদিও সম্ভাবনা অনেক বেশি। যদি শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো প্রশিক্ষণ, ইন্টার্নশিপ ও গবেষণামূলক কাজের সুযোগ দেয়, তাহলে শিক্ষার্থী একধাপে প্রযুক্তিগত দক্ষতা অর্জন করতে পারবে।

এছাড়া কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, 3D প্রিন্টিং, ইন্ডাস্ট্রি 4.0–এর মতো নতুন প্রযুক্তির জন্য প্রশিক্ষকদের দক্ষতা বাড়ানো জরুরি। প্রশিক্ষক যত আধুনিক হবেন, শিক্ষার্থী তত প্রস্তুত হবে। সব মিলিয়ে, প্রযুক্তিনির্ভর কারিগরি শিক্ষা শুধু শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়ন নয়।এটি দেশের অর্থনীতি, উদ্ভাবন ও দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির সবচেয়ে শক্তিশালী ভিত্তি।

কর্মসংস্থানে কারিগরি শিক্ষার ভূমিকা

বাংলাদেশের কর্মসংস্থান কাঠামো দ্রুত বদলে যাচ্ছে, আর এই পরিবর্তনের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে কারিগরি শিক্ষা। আগে যেখানে চাকরি মানে ছিল অফিসকেন্দ্রিক কাজ বা সাধারণ ডিগ্রির ওপর নির্ভরতা, সেখানে এখন দক্ষতার চাহিদা বেড়েছে বহুগুণে। শিল্পপ্রতিষ্ঠান, নির্মাণ খাত, তথ্যপ্রযুক্তি,

টেলিকম, অটোমেশন, এমনকি কৃষি সব ক্ষেত্রেই এমন কর্মী দরকার যারা হাতে-কলমে কাজ জানে। কারিগরি শিক্ষা এই দক্ষতা তৈরি করে বলে কর্মসংস্থানে এর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশে চাকরির বাজারে একটি বড় বৈপরীত্য দেখা যায়। ডিগ্রিধারী তরুণের সংখ্যা বেশি, কিন্তু দক্ষ কর্মীর সংখ্যা কম।

ফলে অনেক প্রতিষ্ঠান প্রয়োজনীয় দক্ষতা না পাওয়ায় বিদেশি শ্রমিক ব্যবহার করতে বাধ্য হয়। অথচ কারিগরি শিক্ষা গ্রহণকারী তরুণরা তুলনামূলক দ্রুত চাকরি খুঁজে পায়, কারণ তাদের দক্ষতা সরাসরি উৎপাদন ও প্রযুক্তি ব্যবস্থাপনায় কাজে লাগে। বিশেষ করে ইলেকট্রিশিয়ান, টেকনিশিয়ান, ওয়েল্ডার,

মেশিন অপারেটর, কম্পিউটার নেটওয়ার্ক এক্সপার্ট কিংবা সোলার টেকনিশিয়ান এসব ক্ষেত্রে নিয়মিত নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে। কারিগরি শিক্ষার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, এটি তরুণদের উদ্যোক্তা হতে সাহায্য করে। অনেকেই ক্ষুদ্র ওয়ার্কশপ, রিপেয়ারিং সেন্টার, ডিজিটাল সার্ভিস পয়েন্ট,

কিংবা টেক–ভিত্তিক ফার্ম খুলে নিজের মতো করে কর্মসংস্থান তৈরি করছে। এতে শুধু ব্যক্তিই নয়, স্থানীয় সমাজও উপকৃত হচ্ছে। সবশেষে, দেশের জনশক্তিকে গ্লোবাল চাকরির বাজারে শক্তিশালী করতে হলেও কারিগরি শিক্ষা অপরিহার্য।

দক্ষতা যত বাড়বে, কর্মসংস্থানের সুযোগও তত বিস্তৃত হবে। এ কারণেই কারিগরি শিক্ষা কর্মসংস্থানের সবচেয়ে কার্যকর ও টেকসই মাধ্যম।

শিল্পখাতে কারিগরি শিক্ষার প্রয়োজন

বাংলাদেশের শিল্পখাত যত দ্রুত প্রসারিত হচ্ছে, ততই স্পষ্ট হচ্ছে যে শুধু সাধারণ শিক্ষায় প্রশিক্ষিত কর্মী দিয়ে এই খাত দীর্ঘমেয়াদে চলতে পারবে না। আধুনিক শিল্পপ্রতিষ্ঠান এখন আর হাতে-কলমে কাজ জানা মানুষের ওপর নির্ভর করে না।

তারা চায় এমন কর্মী, যারা মেশিন পরিচালনা বুঝে, যন্ত্রপাতির সমস্যায় তাৎক্ষণিক সমাধান দিতে পারে এবং উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর জন্য প্রযুক্তিগত দক্ষতা দেখাতে পারে। এ কারণে শিল্পখাতে কারিগরি শিক্ষার প্রয়োজন এখন আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি। শিল্পের প্রকৃতির পরিবর্তনও এই প্রয়োজনীয়তাকে আরও স্পষ্ট করে।

আগে যেখানে শুধু শ্রমশক্তির ওপর নির্ভরতা ছিল, এখন সেখানে অটোমেশন, রোবোটিক মেইনটেন্যান্স, কম্পিউটারাইজড মেশিন কন্ট্রোল এবং প্রডাকশন মনিটরিংয়ের মতো বিষয় যোগ হয়েছে। ফলে যে কর্মী এসব প্রযুক্তি ব্যবহার করতে পারে, তাকে শিল্পমালিকেরা বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে নিয়োগ দেন। অনেক স্থানে দেখা যায়,

স্থানীয়ভাবে দক্ষ কর্মী না পাওয়ায় শিল্পপ্রতিষ্ঠান বিদেশি টেকনিশিয়ান আনতে বাধ্য হয়। যা প্রমাণ করে দেশেই দক্ষতা তৈরির সুযোগ তৈরি হওয়া কতটা জরুরি। কারিগরি শিক্ষার আরেকটি প্রয়োজন দেখা যায় উৎপাদন খরচ কমাতে।

দক্ষ কর্মী মেশিনের ক্ষয়ক্ষতি কমাতে পারে, ত্রুটি দ্রুত চিহ্নিত করে ঠিক করতে পারে এবং উৎপাদন প্রক্রিয়াকে মসৃণ রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এসব কারণেই বিশ্বব্যাপী শিল্পপ্রতিষ্ঠান তাদের অভ্যন্তরীণ প্রশিক্ষণ ব্যবস্থার পাশাপাশি কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক তৈরি করছে।

সার্বিকভাবে বলা যায়, শিল্পখাতের বিকাশে কারিগরি শিক্ষা কোনো পরিপূরক বিষয় নয়; এটি শিল্পের ভিত্তি। যত বেশি দক্ষ কর্মী তৈরি হবে, দেশের শিল্পায়ন তত দ্রুত, শক্তিশালী এবং প্রতিযোগিতামূলক হবে।

কারিগরি প্রশিক্ষণের আধুনিক পদ্ধতি

কারিগরি প্রশিক্ষণের আধুনিক পদ্ধতি এখন আর শুধু ক্লাসরুমে শেখানো তত্ত্বের ওপর নির্ভর করে না, বরং বাস্তব কাজের অভিজ্ঞতা, প্রযুক্তিগত পরিবেশ এবং সমস্যা সমাধানের দক্ষতা গড়ে তোলার দিকে বেশি গুরুত্ব দেয়। আধুনিক প্রশিক্ষণের সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হলো ‘লার্ন বাই ডুয়িং’ বা অভিজ্ঞতাভিত্তিক শেখা।

শিক্ষার্থীরা শুধু মেশিন দেখে নয়, বরং সরাসরি কাজ করে, ভুল করে এবং সংশোধন করতে করতে দক্ষ হয়। এতে তাদের মধ্যে আত্মবিশ্বাস তৈরি হয় এবং শিল্পক্ষেত্রে প্রবেশের আগেই একজন “প্রশিক্ষিত কর্মী” হিসেবে গড়ে ওঠে। বর্তমানে অনেক প্রতিষ্ঠানে ভার্চুয়াল সিমুলেশন ল্যাব ব্যবহার করা হচ্ছে,

যেখানে শিক্ষার্থীরা বাস্তব যন্ত্রপাতির ঝুঁকি ছাড়াই উন্নত মেশিন, ইন্টারফেস কিংবা ইন্ডাস্ট্রিয়াল প্রক্রিয়ার অনুশীলন করতে পারে। এটি বিশেষ করে ইলেকট্রনিক্স, মেকাট্রনিক্স, অটোমেশন ও পাওয়ার টেকনোলজির মতো বিষয়ে অত্যন্ত কার্যকর। একই সঙ্গে “ব্লেন্ডেড ট্রেনিং” নামে একটি নতুন ধারা তৈরি হয়েছে।

যেখানে অনলাইন লেকচার বা ইন্টারেক্টিভ মডিউল দিয়ে তত্ত্ব শেখানো হয় এবং সাইট–ভিজিট বা ল্যাব সেশনের মাধ্যমে হাতে-কলমে দক্ষতা অর্জন করানো হয়। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সহযোগী প্রশিক্ষণ। যেখানে প্রশিক্ষক শুধু শেখান না; বরং শিক্ষার্থীর সঙ্গে একসঙ্গে সমস্যার সমাধান খোঁজেন,

যেন ভবিষ্যতের শিল্প পরিবেশে কাজের সময় দলগতভাবে সিদ্ধান্ত নিতে শিক্ষার্থী প্রস্তুত থাকে। পাশাপাশি, আধুনিক প্রশিক্ষণে সফট স্কিল। যেমন যোগাযোগ দক্ষতা, সময় ব্যবস্থাপনা এবং কর্মনৈতিকতাকেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে,

কারণ প্রযুক্তিগত দক্ষতার মতো এগুলোও সমান প্রয়োজনীয়। সব মিলিয়ে, আধুনিক কারিগরি প্রশিক্ষণ এমন এক পদ্ধতি তৈরি করেছে যেখানে দক্ষতা কেবল শেখানো নয়, বরং বাস্তব কাজের জন্য পরিপূর্ণভাবে প্রস্তুত করে তোলা।

যুবসমাজে কারিগরি শিক্ষার প্রভাব

যুবসমাজে কারিগরি শিক্ষার প্রভাব এখন এমন এক পরিবর্তনের দরজা খুলে দিচ্ছে, যা শুধু কর্মসংস্থান নয়, বরং তাদের মানসিকতা, জীবনদর্শন এবং সামাজিক দায়িত্ববোধ পর্যন্ত বদলে দিচ্ছে। আগে তরুণেরা ভবিষ্যৎ নিয়ে যে অনিশ্চয়তায় ভুগত, কারিগরি শিক্ষা সেই অনিশ্চয়তাকে দক্ষতার শক্তিতে রূপান্তর করছে।

অনেক তরুণ আজ আর শুধু চাকরির জন্য অপেক্ষা করে না; তারা নিজেরাই কাজ তৈরি করার আত্মবিশ্বাস অর্জন করছে। বিশেষ করে স্থানীয় শিল্প, স্টার্টআপ ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা কার্যক্রমে কারিগরি শিক্ষার প্রভাব বিস্ময়করভাবে দ্রুত বাড়ছে। কারিগরি শিক্ষা যুবকদের হাতে এমন বাস্তব অভিজ্ঞতা তুলে দেয়, যা সাধারণ শিক্ষা ব্যবস্থায় পাওয়া যায় না।

যেমনঃ ফিল্ড-ভিত্তিক লার্নিং, বাস্তব কাজের প্রোটোটাইপ তৈরি, কিংবা মেশিন–টুলস ব্যবহার করে সমস্যা সমাধানের দক্ষতা। এই অভিজ্ঞতাগুলো তরুণদের চিন্তাভাবনায় এক ধরনের নতুনত্ব সৃষ্টি করে, যেখানে তারা শুধু শেখা নয়, শেখাকে কাজে পরিণত করার গুরুত্বও বুঝতে শেখে। ফলে তাদের ভেতর সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা,

দলগত কাজের মানসিকতা এবং দ্রুত সমস্যার সমাধান করার অভ্যাস তৈরি হয়। আরেকটি বিশেষ পরিবর্তন দেখা যায় সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিতে। আগে যেখানে কারিগরি শিক্ষাকে অনেকে দ্বিতীয় সারির শিক্ষা মনে করত, এখন যুবসমাজই এটিকে সম্মানের জায়গায় নিয়ে আসছে। তারা বুঝতে পেরেছে দক্ষতা এমন এক সম্পদ,

যার চাহিদা সময়ের সাথে আরও বাড়ে। অনেক তরুণ বিদেশগামী দক্ষ জনশক্তির তালিকায় যুক্ত হচ্ছে, আবার অনেকেই নিজ এলাকায় শিল্প প্রতিষ্ঠা করে কর্মসংস্থান তৈরি করছে। এভাবেই কারিগরি শিক্ষা শুধু একটি শিক্ষাব্যবস্থা নয়, বরং যুবসমাজের সম্ভাবনা জাগানোর এক শক্তিশালী মাধ্যম হয়ে উঠেছে।

কারিগরি শিক্ষা বিস্তারে সরকারি উদ্যোগ

কারিগরি শিক্ষা বিস্তারে সরকারি উদ্যোগ এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি বাস্তবমুখী ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ওপর দাঁড়িয়ে এগোচ্ছে। সরকার শুধু কারিগরি ইনস্টিটিউট সংখ্যা বাড়ানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই।

বরং প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে দক্ষ প্রশিক্ষক গড়ে তোলার প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে। অনেক প্রতিষ্ঠানে এখন শিল্প–কারখানার সঙ্গে সমঝোতা স্মারক করা হচ্ছে, যাতে শিক্ষার্থীরা বইভিত্তিক জ্ঞান নয়, সরাসরি কাজের পরিবেশে প্রশিক্ষণ নিতে পারে। এতে করে চাকরির বাজারে দক্ষ জনবল তৈরির গতি বেড়েছে।

পাশাপাশি সরকার নতুন কারিকুলাম তৈরি করছে, যেখানে প্রযুক্তি পরিবর্তনের সাথে মিল রেখে প্রতি দুই বা তিন বছর পরপর কোর্স আপডেট করা হচ্ছে। আগের মতো শুধু প্রচলিত ট্রেডের ওপর নির্ভর না থেকে এখন যুক্ত হচ্ছে উদীয়মান ক্ষেত্র সোলার টেকনোলজি, ডিজিটাল ফ্যাব্রিকেশন, ড্রোন মেইনটেন্যান্স,

খাবারের সেফটি টেকনোলজি কিংবা স্মার্ট এগ্রি ম্যানেজমেন্টের মতো বিষয়ে প্রশিক্ষণ। এসব কোর্সে স্থানীয় শ্রমবাজারের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারের চাহিদাও বিবেচনা করা হচ্ছে।সরকারি উদ্যোগের আরেকটি উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হলো গ্রামীণ অঞ্চলে কারিগরি শিক্ষা পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা।

অনেক উপজেলায় ছোট পরিসরের টেকনিক্যাল ট্রেনিং সেন্টার চালু করা হয়েছে, যেখানে কৃষিজ যন্ত্রপাতি মেরামত, মোবাইল সার্ভিসিং বা রেফ্রিজারেশন টেকনোলজির মতো স্বল্পমেয়াদি কোর্সে যুবকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। এতে করে শহরমুখী বেকারত্ব কমছে এবং স্থানীয়ভাবে আয়–উপার্জনের সুযোগ তৈরি হচ্ছে।

বিশেষ করে মেয়েদের জন্য প্রযুক্তিভিত্তিক নিরাপদ প্রশিক্ষণ পরিবেশ তৈরি করে সরকার নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দিয়েছে। সব মিলিয়ে সরকারি উদ্যোগ কারিগরি শিক্ষাকে শুধু বিস্তৃতই করছে না, বরং দেশের উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর একটি দীর্ঘমেয়াদি ভিত্তিও তৈরি করছে।

বেসরকারি খাতে কারিগরি শিক্ষার অবদান

বেসরকারি খাতে কারিগরি শিক্ষার অবদান এখন দেশের দক্ষতা–ভিত্তিক অর্থনীতিকে সামনে এগিয়ে নেওয়ার সবচেয়ে শক্তিশালী চালিকাশক্তিগুলোর একটি হয়ে উঠেছে। সরকারি উদ্যোগ যেখানে কাঠামো তৈরি করে, সেখানে বেসরকারি খাত সেই কাঠামোর ভেতরে প্রাণ সঞ্চার করে। বিশেষ করে প্রযুক্তি,

গার্মেন্টস, নির্মাণ, স্বাস্থ্যসেবা, আইটি এবং সেবা–ভিত্তিক শিল্পে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো কারিগরি শিক্ষাকে এমনভাবে ব্যবহার করছে, যা তরুণদের চাকরি–প্রস্তুত করে তুলছে আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় দ্রুত। অনেক প্রতিষ্ঠান নিজস্ব ট্রেনিং সেন্টার গড়ে দক্ষ কর্মী তৈরি করছে। যা শুধু তাদের উৎপাদন বাড়াচ্ছে না,

বরং আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।আগ্রহজনক বিষয় হলো, বেসরকারি খাতে কারিগরি শিক্ষা সাধারণ ডিপ্লোমা বা সার্টিফিকেটের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না। অনেক প্রতিষ্ঠান এখন বাস্তব কাজ–নির্ভর “ইন্টার্নশিপ–ইন্টিগ্রেটেড ট্রেনিং” চালু করেছে, যেখানে প্রশিক্ষণই পরিণত হয় সরাসরি অভিজ্ঞতায়।

একই সঙ্গে, আধুনিক যন্ত্রপাতি ব্যবহারের দক্ষতা শেখাতে অনেক প্রতিষ্ঠান বিদেশি বিশেষজ্ঞ এনে হাতে–কলমে প্রশিক্ষণ দিচ্ছে। যা দেশে খুব কম লোক এখনো জানে। ফলে তরুণরা এমন দক্ষতা অর্জন করছে যেগুলোর চাহিদা শুধু দেশে নয়, বিদেশেও দ্রুত বাড়ছে।

বেসরকারি খাত কারিগরি শিক্ষাকে ভবিষ্যতের কর্মসংস্থানের সাথে যুক্ত করেছে আরেকটি কারণে। চাহিদা অনুযায়ী পাঠক্রম তৈরি করার স্বাধীনতা। তারা শ্রমবাজারের পরিবর্তন খুব দ্রুত ধরতে পারে, এবং সে অনুযায়ী কোর্স আপডেট করে। এর ফলে দক্ষতা আর শিল্পের চাহিদার মধ্যে ফাঁক কমে আসে।

এই বাস্তব অভিজ্ঞতাই দেখিয়ে দেয় যে কারিগরি শিক্ষার বিস্তার শুধু সরকারের ওপর নির্ভর নয়। বরং বেসরকারি খাতই দক্ষ মানবসম্পদ গঠনের সবচেয়ে কার্যকর অংশীদার হয়ে উঠেছে।

লেখকের শেষ কথা

কারিগরি শিক্ষা বাংলাদেশের অর্থনীতি ও শিল্পক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। শিক্ষার্থীরা কারিগরি দক্ষতা অর্জনের মাধ্যমে স্বনির্ভর ও সফল পেশাজীবী হয়ে উঠতে পারে। তাই দেশের উন্নয়ন ও ব্যক্তিগত সাফল্যের জন্য কারিগরি শিক্ষার গুরুত্ব অনস্বীকার্য এবং প্রত্যেক শিক্ষার্থীর উচিত এই সুযোগ গ্রহণ করা।

এই পোস্টটি পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন

পূর্বের পোস্ট দেখুন পরবর্তী পোস্ট দেখুন
এই পোস্টে এখনো কেউ মন্তব্য করে নি
মন্তব্য করতে এখানে ক্লিক করুন

এম এ এইচ টেক আইটির সকল নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন।প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়...

comment url